Header Ads

ভ্যাটিকান সিটি : পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশের পরিচয়

পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশ ভ্যাটিকান সিটি। দেশটিকে খ্রিষ্ট ধর্মালম্বীদের বলা হয়। কারণ, খ্রিষ্ট ধর্মালম্বীদের ধমীর্য় গুরু পোপ এখানে বসবাস করেন। চারদিকে দেয়াল ঘেরা দেশটির আয়তন প্রায় ০.৪৪ বর্গ কিলোমিটার বা ০.১৭ বর্গ মিটার বা ১১০ একর। দেশটির জনসংখ্যা ২০১০ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী ৮২৯ জন। দেশটিতে প্রবেশ পথ রয়েছে মোট ছয়টি। দেশটির নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত রয়েছে সুইজারল্যান্ডের ৩ হাজার সুইস গার্ড এবং হোলিসির নিরাপত্তার জন্য রয়েছে ১৩৪ সদস্যের বিশেষ গার্ড।


পূর্বে ভ্যাটিকান ছিল ইতালির রাজধানী রোম নগরীর একটি অংশ। ১৮৭০ সালে ভিক্টর ইমানুয়েল ভ্যাটিকান সহ রোম নগরী দখল করেন। ভ্যাটিকান লাটোরান চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করে ১১ ফেব্রুয়ারী ১৯২৯ সালে ইতালীর কাছ থেকে। দেশটির জাতীয় ভাষা ইতালিয়ান বা ল্যাটিন। ভ্যাটিকানের মুদ্রার নাম ইউরো। সমগ্র ভ্যাটিকান রাষ্ট্রটি প্রাচীর দ্বারা বেস্টিত। প্রাচীরের ভেতরে রয়েছে উদ্যান, বাহারী দালান ও চত্বরের সমাবেশ। সবচেয়ে বড় দালানটি হলো সেন্ট পিটারের ব্যাসিলিকা, যা রোমান ক্যাথলিকদের প্রধান গির্জা। ভ্যাটিকান সিটিতে রয়েছে একটি মহাকাশ অবজারভেটরি লাইব্রেরী, যার নাম ভ্যাটিকানা। ভ্যাটিকান সিটির নিজস্ব সংবিধান, ডাকব্যবস্থা, সীলমোহর, পতাকা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতীক আছে। "ভ্যাটিকান রেডিও" নামে ভ্যাটিকানে একটি সরকারি বেতার স্টেশন আছে। যেখান থেকে সারা বিশ্বে পোপের কণ্ঠ ছড়িয়ে দেয়া হয়। ভ্যাটিকানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে ও পোপের দেয়া বিশেষ দায়িত্ব পালন করে এখানকার নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব।

খ্রিষ্ট ধর্মালম্বীদের ধর্মীয় নেতা পোপ এখান থেকে নির্বাচন করা হয় এবং তিনি এখানে বসবাস করেন। এছাড়া পোপ হচ্ছেন এই রাষ্ট্রের সর্বময় প্রধান। সমগ্র বিশ্ব থেকে আসা কার্ডিনালদের অত্যন্ত গোপনীয় মিটিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয় নতুন পোপ। পোপ নির্বাচিত হতে হলে বয়স ৮০ বছরের কম হতে হয় এবং কোন পোপের মৃত্যুর ১৮ দিনের মধ্যে নতুন পোপ নির্বাচন করা হয়। বর্তমান পোপ হচ্ছেন পোপ ষোড়শ বেনিডিক্ট। তিনি ২৬৫ তম পোপ।

এই রাষ্ট্রের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তনের আগে থেকেই এই রাজ্যের স্থানটুকুকে পবিত্র বলে গণ্য করা হতো এবং রোমের এই অংশটুকুতে এর আগে কখনই বসতি গড়ে উঠেনি বা কেউ এখানে বসতি স্থাপন করতে চায়নি। রোমান সাম্রাজ্যের সময় এই স্থানে ফ্রিজিয়ান দেবী সিবেল এবং তার স্বামী আটিসের উপাসনা করা হতো। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর কোনো এক সময়ে আগ্রিপিনা দ্য এল্‌ডার (খ্রিস্টপূর্ব ১৪ - ৩৩ খ্রিস্টাব্দ) এই অঞ্চলের একটি পাহাড় কেটে বিশাল উদ্যান তৈরি করেন।

পরবর্তীতে সম্রাট ক্যালিগুলা এখানে একটি সারকাস তৈরির উদ্যোগ নেন যদিও তিনি তা সম্পূর্ণ তৈরি করে যেতে পারেননি। তার পরবর্তী সম্রাট নিরো এই সারকাস সম্পন্ন করেন। এই সারকাসটিকে তাই "নিরোর সারকাস" নামে আখ্যায়িত করা হয়। বর্তমানে সেই ভ্যাটিকানের একমাত্র দৃশ্যমান ভগ্নাবশেষ হচ্ছে ভ্যাটিকান ওবেলিস্ক। এই ওবেলিস্কটি সম্রাট ক্যালিগুলা হেলিওপলিস থেকে ভ্যাটিকানে নিয়ে এসেছিলেন তার সারকাসের স্পিনা সাজানোর জন্য। ৬৪ খ্রিস্টাব্দে রোমে বৃহৎ অগ্নিকাণ্ডে শহীদ খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল হিসেবে এই স্থানটিকে ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রাচীন প্রথাগত বিশ্বাস অনুসারে বলা হয় এই সারকাসের প্রান্তরেই সেন্ট পিটারকে মাথা নিচে ও পা উপরে দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল।

সারকাসের বিপরীত দিকে ছিল একটি সমাধিসৌধ, যা ভিয়া করনেলিয়া দ্বারা সারকাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিল। এই ভ্যাটিকানেই বহুত্ববাদী ধর্মগুলোর উপাসনালয়, শেষকৃত্যের সৌধ এবং অন্যান্য সৌধ ও মিনার নির্মিত হয়েছিল। এই সবকিছু নির্মিত হয়েছিল ৪র্থ খ্রিস্টাব্দের আগে। ৪র্থ খ্রিস্টাব্দের প্রথমভাগে সম্রাট কন্‌স্টান্টাটাইন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং তিনিই ভ্যাটিকানের কেন্দ্রভূমিতে সেন্ট পিটারের ব্যাসিলিকা নির্মাণ করেন। তখন ভ্যাটিকানের প্যাগান স্থাপনাসমূহ ধ্বংস করে ফেলা হয়। এই ব্যাসিলিকাটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে পোপদের সক্রিয় তত্ত্বাবধানে ব্যাসিলিকার মূল স্থাপনা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। বিশেষত রেনেসাঁর সময় এর খননকাজ দ্রুত এগোতে থাকে। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে পোপ দ্বাদশ পিউস-এর নির্দেশে সম্পূর্ণ স্থাপনাটি ভূমি থেকে উত্তোলিত করা হয়।

ভ্যাটিকান সিটির আয়ের উৎস হচ্ছে, বিশ্বের রোমান ক্যাথিলিকদের অনুদান। এছাড়া ডাকটিকিট, পর্যটক স্মারক বিক্রি ও যাদুঘর দর্শনের টিকিট ও আয়ের উৎস। ইউনেস্কো ১৯৮৪ সালে ইতিহাস ও সংগ্রহশালার উপর ভিত্তি করে এই স্থানটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অর্ন্তভুক্ত করে। পর্যটকদের কাছে ভ্যাটিকান সিটি একটি আকর্ষণীয় স্থান।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.