বিশ্বের শীর্ষ সিরিয়াল কিলার খুনিরা (শেষ)
সিরিয়াল কিলার বলা হয় সেই সকল কুখ্যাত ব্যক্তিদের যারা একের পর এক মানুষ হত্যা করেছে নিজ হাতে। নিজের রাগ, ক্ষোভ, যৌন চাহিদা, দুনিয়ার প্রতি ঘৃণা, ভালবাসায় ব্যর্থতা সহ বিভিন্ন কারণে কুখ্যাত সিরিয়াল কিলাররা এই ধরনের মানুষ হত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে রয়েছে বহু সংখ্যক সিরিয়াল কিলার। যাদের সমগ্র জীবনটাই শুধু পাপ, পাপাচার আর নানান অপকর্মে ভরপুর।
বিশ্বের
শীর্ষ দশ সিরিয়াল কিলার
সম্পর্কে জানতে গিয়ে ইতোমধ্যে ১ম ও ২য়
পর্বে আমরা ধারাবাহিকভাবে সাত জন সিরিয়াল কিলার
সম্পর্কে জেনেছি। আজ আমরা বাকি
কয়েকজন শীর্ষ সিরিয়াল কিলার সম্পর্কে শেষ পর্বে জানবো।
জন জর্জ হাই:
কুখ্যাত
সিরিয়াল কিলার জন জর্জ হাই
১৯০৯ সালের ২৪ জুলাই জন্ম
গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের একজন সিরিয়াল কিলার। ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে তিনি তার পাশবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। জর্জ হাই ‘এসিড গোসলের হত্যাকারী’ হিসেবেও পরিচিত ছিল। বিচারের সময় তার বিরুদ্ধে ৬ জনকে হত্যার
অভিযোগ আনা হয়, কিন্তু তিনি মোট ৯ জনের মতো
মানুষকে হত্যা করেছিলেন।
জর্জ হাই মানুষকে হত্যার পর লাশটির দেহ পচে যাওয়ার জন্য সেটি সালফিউরিক এসিড দিয়ে ডুবিয়ে রাখতো। তারপর সেটি গলে কাদার মতো হয়ে গেলে লাশটি প্যাকেট করে ফেলে দিত। তারপর সে মৃত ব্যক্তির বিশাল সম্পত্তি বিক্রয় করে মোটা অংকের টাকা হস্তগত করতো। তার ভ্রান্ত ধারনা ছিল যে, পুলিশ যদি কোনও লাশ হাতে পায় তাহলে তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনতে পারবে না। অবশ্য ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ১৯৪৯ সালের ১০ আগস্ট তার উপর বিচার কার্যকর করা হয়।
লন্ডনের গুলিসিস্তার সড়কে বাসা ভাড়া নেওয়ার পর জর্জ কিংস্টনের সম্পদশালী ব্যক্তি উইলিয়াম ম্যাক সোয়ানের কাজ নেন। উইলিয়াম ম্যাক শোয়ান জর্জকে কাজে নিয়েছিল তার পিতা-মাতা ডোনাল্ড ও এমিকে দেখাশুনা ও তাদের সম্পদের তদারকি করার জন্য। ১৯৪৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তারিখে শোয়ান হঠাৎ হারিয়ে যান। পরে অবশ্য জর্জ স্বীকার করে যে, সে শোয়ানকে লন্ডনের গুলিসিস্তার সড়কের বাড়িতে তাকে প্রচণ্ড আঘাতে হত্যা করেছিল এবং পরে তার লাশ একটি ড্রামের মধ্যে ৪০ গ্যালন সালফিউরিক এসিডের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছিল। দুদিন পরে সে সোয়ানের লাশকে তুলে ম্যানহোলে ফেলে দিয়েছিল। একের পর এক মানুষ হত্যাকারী এই কুখ্যাত ব্যক্তিকে ১০ আগস্ট ১৯৪৯ সালে বিচারের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাকে হত্যা করা হয়।
জাভেদ ইকবাল:
পাকিস্তানের
কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার জাভেদ ইকবাল মুঘল। ১৯৫৬ সালে এই কিলার পাকিস্তানের
লাহোরে জন্ম গ্রহণ করেন। সে মাত্র ১৮
মাসের মধ্যে ১০০ জন বালককে হত্যা
করেছিল। ১৯৯৮ সালে দুই বালককে টাকার জন্য যৌন হয়রানির দায়ে তাকে প্রথম গ্রেফতার করা হয়। জামিনে বের হওয়ার পর ইকবাল পুরোপুরিভাবে
তার জঘন্যতম কুকর্মে লিপ্ত হন। রাস্তা থেকে তিনি বালকদের ফুসলিয়ে তার ঘরে নিয়ে আসতেন এরপর তাদেরকে মদ পান করানো
ও যৌনাচারের পর তাদেরকে হত্যা
করতেন। জাভেদ বালকদের মৃত শরীরকে খণ্ড-বিখণ্ড করে কেটে ফেলতো তারপর সেই খণ্ডিত দেহের অংশগুলো হাইড্রোক্লোরিক এসিডে ডুবিয়ে রাখতো।
এসিডে ডুবিয়ে রাখার ফলে শরীরের অংশগুলো তরল হয়ে গেলে তিনি সেগুলোকে আবর্জনা স্তূপে ফেলে দিয়ে আসতেন। প্রচণ্ড দুর্গন্ধ হয়ে যতক্ষণ না পর্যন্ত তার প্রতিবেশীরা তাকে অভিযোগ করতো ততদিন পর্যন্ত তিনি এই দেহবাশেষ পরিষ্কার করতেন না। শরীর পচে গন্ধ হয়ে গেলে তিনি সেগুলো রাভি নদীতে ফেলে দিতেন।
তার
হত্যা করা বালকদের মধ্য থেকে দুজন বালকের শরীরের অংশ তিনি এসিড দ্বারা তরল করেননি। তাদের মধ্য থেকে একজনের নাম ছিল এজাজ। জাভেদ তাকে হত্যা করার পর তার শরীরের
কিছু অংশ তার বাড়ির পাশে ফেলে রেখেছিল। এছাড়াও সে হত্যাকাণ্ডের পোশাক
ও জুতা সংরক্ষণে রেখেছিল। জাভেদ যখন তার পঞ্চাশতম হত্যায় পৌঁছেছিল তখন থেকে সে হত্যা করা
বালকদের ছবি তুলে রাখতো। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর জাভেদ বলেছিলেন
তিনি ইচ্ছা করলে ৫০০ জন বালককে হত্যা
করতে পারতেন। জাভেদ একটি পত্র লেখেন যে পত্রে তিনি
তার দোষের কথা স্বীকার করেন। তিনি পত্রে লেখেন যৌনাচারের পর তিনি ১০০
জন বালককে হত্যা করেছেন।
তিনি
এই পৃথিবীকে ঘৃণা করেন, তিনি আর বাচতে চান
না তিনি মরার জন্য প্রস্তুত। তিনি ১০০ জনকে হত্যা করেছেন এর জন্য তার
কোনও পরিতাপ নেই। তিনি লিখেছিলেন তার ঘরে তার নিজের লেখা একটি ডায়েরী ও ৩২ পৃষ্ঠার
নোটবুক আছে, যেটিতে তিনি প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত লিখে রেখেছেন। বিচারে জাভেদ ইকবালকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়। কিন্তু ২০০১ সালের ০৭ অক্টোবর কারাগারে
তাকে শ্বাসরোধ অবস্থায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অনেকের ধারনা তিনি নিজেই আত্মহত্যা করেছিলেন।
টেড বানডি:
হেডোর
রবার্ট টেড বানডি আমেরিকার ইতিহাসে একজন কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ছিলেন। এই কিলার ১৯৪৬
সালের ২৪ নভেম্বর আমেরিকাতে
জন্ম গ্রহণ করেন। বানডি ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে আমেরিকায় বহু সংখ্যক যুবতীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন।
দীর্ঘ এক দশক ধরে
তিনি প্রায় ৭০ জনকে হত্যা
করেন, তবে তার প্রকৃত হত্যার সংখ্যা জানা যায় না। বানডি তার শিকারগুলোকে প্রথমে ধর্ষণ করতো এরপর তাদের নির্মম প্রহার করে বা গলা টিপে
হত্যা করতো।
দিনে, রাতে বা এমনকি জনাকীর্ণ পাবলিক স্থানে বানডি শিকারের কাছাকাছি হতো। অনেক সময় সে লেক বা বিদ্যালয় থেকেও তার শিকার ধরতো। বানডি বিভিন্ন উপায়ে তার সততার পরিচয় দিত। সে অনেক সময় শিকারের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য তার হাতকে কাপড়ের সাথে ঝুলিয়ে আহত হওয়ার ভান করতো। বানডি নিজেকে বাচাতে নানান রকম নাটক ও ছলচাতুরীর আশ্রয় নিত। ক্যারল ডিরোন্চকে হত্যা করার সময় বেনডি পুলিশের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিল। এছাড়াও সে ফায়ার সার্ভিস সদস্যের পরিচয় নিয়ে সে এক যুবতীকে হত্যা করেছিল।
এক
যুবতীর গাড়িতে পাশাপাশি বসে চড়ার সময় এক লোহার রডের
আঘাতে সে তাকে হত্যা
করেছিল। বানডি যখন শিকার ধরতো তখন সে প্রচুর মদপান
করতো। মৃত্যুর সারিতে বানডি ১২ জনকে জবাই
করে হত্যা করেছিল। হত্যা করা সেই মাথাগুলোকে তার ঘর বা এলাকায়
পাওয়া গিয়েছিল, পরে অবশ্য মাথাগুলো নষ্ট করে ফেলার পূর্বে পুলিশ এই মাথাগুলো উদ্ধার
করেছিল।
বিচারের
রায় হওয়ার পর ১৯৮৯ সালের
২৪ জানুয়ারি স্থানীয় সময় সকাল ৭:৬ মিনিটে
বানডিকে বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুর আগে সে তার শেষ
বাক্য হিসেবে বলেছিল “আমি তোমাকে ভালবাসতাম আমার পরিবার ও বন্ধুদের ভালবাসা
ফেরত পেতে”।
এরকম
আরও পড়ুন:
কোন মন্তব্য নেই