পথ শিশুরা কেন শিক্ষা বঞ্চিত? রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় বিধান
শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বলবে
আসলে এই কথাটি অনেক মূল্যবান একটি কথা, যেটি চিন্তা করলে বেরিয়ে আসবে আমাদের
রাষ্ট্রযন্ত্রের নগ্ন চেহারা। আমরা বলছি শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌছে দিবো কিন্তু
যাদের ঘরই নাই তাদের দিকে কিন্তু আমরা ফিরে তাকায় না। যাদের ঘরই নাই তাদের ঘরে
আপনি শিক্ষা কিভাবে পৌছে দিবেন? ঢাকা শহরে প্রায় ১৫ লাখের মতো পথ শিশু বসবাস করে
যাদের নির্দিষ্ট কোনও আবাস স্থল নেই এবং নেই কোনও ঘুমানোর জায়গা। যেখানে রাত
সেখানেই কাত এই রকম অবস্থায় বসবাস করে এদেশের পথ শিশুরা। এখন প্রশ্ন হলো দেশে তো
প্রতি বছর লক্ষ কোটি টাকার বাজেট হয় সেখানে বলা হয় সর্বাধিক অগ্রাধীকার দেয়া হয়
শিক্ষা খাতকে। বিশাল অংকের এই শিক্ষা বাজেট ব্যয় করা হয় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান বাড়াতে। শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌছে দেয়ার জন্যই এই
প্রচেষ্টা কিন্তু যাদের ঘরই নেই তাদের কি হবে? যে সকল শিশুরা পথে থাকে, যারা
ভবঘুরে তাদের জন্য বাজেটে কি থাকে? তারা কি এই শিক্ষা বাজেটের অর্ন্তভূক্ত?
বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ঘোষনা
হয় ৩০ জুন ১৯৭২ সালে, ঘোষনা করেন তাজউদ্দীন আহমেদ এবং সেই বাজেটের আকার ছিল মাত্র
৭৮৬ কোটি টাকার। এই বাজেটে নতুন রাষ্ট্র কাঠামো তৈরির জন্য শিক্ষার বাজেট ছিল
প্রায় ১০ শতাংশ এর মতো। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল ঘোষনা
করেন ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বিশাল বাজেট, আর এই বাজেটে শিক্ষার জন্য
বরাদ্দ রাখা হয় ১৫.২ শতাংশ। এছাড়াও বাংলাদেশে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আরও ৪৭টি বাজেট
প্রদান করা হয়েছে কিন্তু শিক্ষার বাজেট সেই তুলনায় বৃদ্ধি পায়নি। গড়ে ১২% এর মতো
অর্থ ছাড় করা হয় শিক্ষা খাতে প্রতি বছরের বাজেটে। গত তিন বছরের বাজেট যদি আমরা
দেখি তবে ২০১৬-১৭ সালের বাজেটে শিক্ষার বরাদ্দ ছিল ১৪.৩৯ শতাংশ, ২০১৭-১৮ সালে ছিল
১২.৬ শতাংশ এবং ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে শিক্ষার বরাদ্দ ছিল ১১.৫৩ শতাংশ। বোঝা গেলো
বাংলাদেশের শিক্ষার বাজেট কম কিন্তু একেবারে শুন্য নয়। ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেটের
১৫ শতাংশ কম টাকা নয়। এবার দেখা যাক শিক্ষার এই বরাদ্দ কোন কোন খাতে ব্যয় করা হয়।
শিক্ষা বাজেটের সাথে প্রযুক্তি, খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, ধর্মসহ
নানাবিধ খাতকে জুড়ে
দেয়া হয়। এমনটি
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেটে সামরিক বাহিনী পরিচালিত
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের বারদ্দও ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ফলে বরাদ্দকৃত স্বল্প
অর্থটুকুও ভাগাভাগি হয়ে যায় অন্যান্য খাতের সাথে।
এছাড়া শিক্ষা খাতের বড় একটি অংশ ব্যয় করা হয় অনুন্নয়ন খাতে। শিক্ষা
অবকাঠামোর দেখভাল, শিক্ষার্থীদের
জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক,
শিক্ষা-সহায়ক উপকরণ সরবরাহ ও সর্বোপরি শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োজিত
শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্তচারীর
বেতন এই অনুন্নয়ন খাতের অংশ। শিক্ষা খাতের মোট অংশ থেকে আবার ১১ শতাংশ ব্যয় করা হয়
বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে। বাকি যে অর্থ থাকে শিক্ষা
খাতে সেই গুলো ব্যয় করা হয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা,
ভোকেশনাল, টেকনিক্যাল, মেডিকেল এবং বাকি অনান্য শিক্ষা মাধ্যমে।
এই গেলো শিক্ষা খাতের বাজেটের হিসাব। এখানে কি পথ শিশুদের জন্য
কিছু খুজে পেলেন? শিক্ষা বাজেট তাদের জন্য যারা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে
পড়ে, অর্থাৎ যাদের ঘর আছে তাদের ঘরে শিক্ষার আলো পৌছে দেয়ার জন্য এই বাজেট। তাহলে
যাদের ঘর নেই তাদের কি হবে?
এবার দেখা যাক শিক্ষা ছাড়া অন্য কোনও বিভাগে পথ শিশুদের জন্য
কিছু রাখা হয় কিনা। আপনি শুনলে অবাক হবেন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে শিশুদের জন্য
বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮০ হাজার কোটি টাকা। অবাক হলেন? কোথায় ৫০০ কোটি আর কোথায় ৮০
হাজার কোটি। এবার আপনার মনে হতে পারে প্রতি বছর বাজেটে শিশুদের জন্য যদি এতো এতো
টাকা বাজেট হয়ে থাকে তবে কেন পথ শিশুরা রাস্তায় ঘুমায়? কেন তাদের পরণে ছেড়া ফাটা
বস্ত্র থাকে? কেন তাদের ভিক্ষা করতে হয়? কেন তারা ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খায়?
এবার আসুন সেই প্রশ্নের উত্তর খোজা যাক।
শিশুদের জন্য যে বিশাল বরাদ্দের কথা বললাম এর পেছনেও থাকে
শুভংকরের ফাকি। এই যে বিশাল বরাদ্দের অংক শুনলেন এই গুলো মোট ১৫টি আলাদা আলাদা
মন্ত্রনালয়ে আবার ভাগ হয়ে যায়। প্রাথমিক ও গনশিক্ষা মন্ত্রনালয়, কারিগরি ও মাদরাসা
বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ,
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়, দূযোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, সমাজ
কল্যাণ, স্থানীয় সরকার, জননিরাপত্তা, আইন, ক্রীড়া, তথ্য সহ এমন ১৫টি বিভাগে ভাগ
হয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ে এই বিশাল বরাদ্দটি। পরে মন্ত্রনালয় গুলো তাদের স্বাধীনভাবে এই
টাকা খরচ করে থাকে। কেউ উন্নয়ন মূলক, কেউ আর্থসামাজিক আবার কেউ এই টাকা অন্য খাতে
ব্যয় করে। এই ধরুন তথ্য মন্ত্রনালয় তথ্য দিলো, ত্রাণ মন্ত্রনালয় কিছু ত্রাণ দিলো,
মহিলা ও শিশু মন্ত্রনালয় নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের কাজে ব্যয় করলো, যুব ক্রীড়া
মন্ত্রনালয় খেলার কাজে ব্যয় করলো, আইন মন্ত্রনালয় আইন তৈরির কাজে, সংস্কৃতি
মন্ত্রনালয় নাচ গান প্রসারের কাজে ব্যয় করলো, আর ঠিক এভাবেই টাকা গুলো একসময় নাই
হয়ে গেলো কিন্তু টাকা গুলো যাদের দরকার ছিল তাদের পকেট ফাকাই থেকে গেলো।
এই হিসাবের মধ্যে ইতিবাচক একটি মন্ত্রণালয় আছে আর সেটি
হচ্ছে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তাদের
অধীনে দেশের শিশু সদনগুলো চালানো হয় এবং অভাবী বঞ্চিতদের সাহায্য করা হয়। কিন্তু
বিশাল বঞ্চিতদের এই সাগরে অর্থ সংকট সবসময় প্রকটই থেকে যায়।
দেখলেন কিভাবে বাজেট করা হয় পথ শিশুদের জন্য জন্য। এটা গেলো
সরকারি অর্থের উৎস কিংবা জাতীয় বাজেট। এবার আসি আমাদের ব্যক্তিগত হিসেবে। এই দেশে
বর্তমানে ধনীর সংখ্যা কম নয়। যে দেশে যত ধনী সেই দেশের পথ শিশুরা তত দ্রুত উন্নয়ন
হওয়ার কথা। আর সেটি যদি হয় কোনও মুসলিম দেশ তাহলে তো কথায় নেই। ইসলামের অন্যতম
একটি মাধ্যতামূলক বিষয় হচ্ছে যাকাত। এছাড়াও আছে ব্যক্তিগত দান, সদাকাহ ও ফিতরা।
রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষ যদি সঠিকভাবে তার জাকাত, ফিতরাহ আদায় করে তবে এই ধরনের পথ
শিশুদের জীবন ফিরতে সময় লাগে না। রাষ্ট্র একটি বাজেটে পথ শিশুদের জন্য যে বাজেট
রাখে রাষ্ট্রের জনগন সঠিকভাবে জাকাত ফিতরাহ আদায় করলে তার থেকে কয়েক গুন বেশি অর্থ
পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা আসলে যতই ধনী হই না কেন নিজের টাকায় যে অণ্যের হক থাকতে
পারে সেটা বেমালুম ভুলে যায়। আসলে ভুলে যায় না, আমরা ইচ্ছা করে ভুলে থাকি।
এদেশের
মসজিদ মক্তবে নামাজ, রোজা, কুরবানি, দ্বীনের দাওয়াত বিষয়ে বারবার নসিহত করা হয়
কিন্তু যত দিন যাচ্ছে যাকাত শব্দটাই যেন সবার কাছে অচেনা হয়ে উঠছে, কারণ এটি নিয়ে
কেউ আলোচনা করতে চাই না। কিন্তু কেন চাই না সেটিরও রয়েছে সঠিক ব্যাখা। নামাজ,
রোজা, দ্বীনের দাওয়াতে নিজে পকেট থেকে কোনও বড় ধরনের অর্থ ব্যয় হয় না, কুরবানিতে অর্থ
ব্যয় হলেও এটা সামাজিক স্টাটাস ধরে রাখার জন্য করা হয়, এমনকি প্রতিযোগীতাও করা হয়।
কুরবানির আরও একটি বিষয় আছে আর সেটি হচ্ছে কুরবানির মাংস নিজেরাই ভোগ করা যায়, ফলে
কুরবানিতে লস নেই। আর যাকাতের বেলায় পকেট থেকে অনেক গুলো টাকা বের হয়ে যায় কিন্তু
তাতে নিজের কোনও লাভ থাকে না কিংবা থাকে না কোনও সামাজিক খ্যাতি। আর তাই যত দিন
যাচ্ছে এই বিষয়টি মানুষের মন থাকে হারিয়ে যাচ্ছে।
কোন মন্তব্য নেই