হিজবুল্লাহ কারা? ইতিহাস সামরিক শক্তি ও রাজনীতি
হিজবুল্লাহ (Hezbollah) একটি শিয়া মুসলিম রাজনৈতিক এবং সামরিক সংগঠন, যা লেবাননে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সংগঠনটি মূলত ইরানের সমর্থন নিয়ে গঠিত হয়েছিল ১৯৮০-এর দশকে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য। হিজবুল্লাহ লেবাননে রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিত।
হিজবুল্লাহ কারা?
হিজবুল্লাহ আরবি حزب الله আক্ষরিক অর্থে "আল্লাহর দল" অথবা "স্রষ্টার দল"। এটি লেবানন ভিত্তিক শিয়া
হিজবুল্লাহ প্রতিষ্ঠার পটভূমি:
লেবাননের গৃহযুদ্ধ (১৯৭৫-১৯৯০): লেবাননের শিয়া মুসলিমরা গৃহযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে ছিল। এ সময় বিভিন্ন শিয়া সংগঠন গড়ে ওঠে,
যার মধ্যে অন্যতম ছিল আমাল মুভমেন্ট।
ইরানের ইসলামী বিপ্লব (১৯৭৯): ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পরে,
ইরান তার বিপ্লবের আদর্শকে অন্যান্য শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। ইরান লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়কে সমর্থন দিতে শুরু করে এবং হিজবুল্লাহর উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইসরায়েলের লেবানন আক্রমণ (১৯৮২): ১৯৮২ সালে ইসরায়েল লেবাননে আক্রমণ করে এবং দক্ষিণ লেবানন দখল করে নেয়। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ গঠিত হয়,
মূলত ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC)-এর সহায়তায়। হিজবুল্লাহর মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের দখলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা।
প্রাথমিক বছর এবং প্রতিরোধ:
প্রতিষ্ঠা (১৯৮৫): আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮৫ সালে হিজবুল্লাহ নিজেদের একটি সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে এবং তাদের প্রথম প্রকাশিত ম্যানিফেস্টোতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জিহাদ এবং পশ্চিমা শক্তির প্রভাব হ্রাস করার কথা বলা হয়।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ: ১৯৮০-এর দশকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি বাহিনী এবং দক্ষিণ লেবাননের ইসরায়েল-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে থাকে। এ সময় তারা আত্মঘাতী বোমা হামলাসহ বিভিন্ন আক্রমণের কৌশল প্রয়োগ করে।
বৈরুত বোমা হামলা (১৯৮৩): হিজবুল্লাহর সাথে যুক্ত মিলিশিয়া গোষ্ঠী বৈরুতে মার্কিন দূতাবাস এবং সামরিক ব্যারাকের ওপর আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায়। এই হামলায় শতাধিক মার্কিন এবং ফরাসি সেনা নিহত হয়। হিজবুল্লাহ এই হামলার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়।
১৯৯০-এর দশক: রাজনৈতিক ও সামরিক উত্থান:
লেবাননের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি: ১৯৯০ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধ শেষ হয় এবং হিজবুল্লাহ লেবাননের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ শুরু করে। তারা দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি দখলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে থাকে।
ইসরায়েলের প্রত্যাহার (২০০০): ২০০০ সালে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করে। হিজবুল্লাহ এটি তাদের বড় বিজয় হিসেবে ঘোষণা করে এবং লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ায়।
২০০০-এর দশক: রাজনৈতিক শক্তি এবং যুদ্ধ:
২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধ: ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সঙ্গে একটি বড় ধরনের সংঘর্ষে লিপ্ত হয়,
যা ৩৪ দিন ধরে চলে। এই যুদ্ধের ফলে হাজার হাজার লেবানিজ এবং ইসরায়েলি নিহত ও আহত হয়,
এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। হিজবুল্লাহ যুদ্ধের পরও সামরিকভাবে অক্ষত থাকে এবং তাদেরকে লেবাননের প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রাজনৈতিক অংশগ্রহণ: হিজবুল্লাহ লেবাননের সংসদে এবং সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুরু করে,
যা তাদেরকে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে।
বর্তমান এবং ভবিষ্যত ভূমিকা:
সিরিয়া গৃহযুদ্ধে ভূমিকা: ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে হিজবুল্লাহ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষে লড়াই করতে শুরু করে। তাদের এই ভূমিকা লেবাননের অভ্যন্তরে বিতর্কিত হয়েছে,
কিন্তু সিরিয়া এবং ইরানের সাথে তাদের সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে।
আঞ্চলিক প্রভাব: হিজবুল্লাহ বর্তমানে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃত,
এবং ইরানের সমর্থনে তারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করে এবং লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়ের বৃহত্তর অংশের সমর্থন পেয়ে থাকে।
হিজবুল্লাহ এর লক্ষ্য এবং কার্যক্রম:
ইসরায়েলের বিরোধিতা: হিজবুল্লাহর মূল লক্ষ্য ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা, বিশেষত লেবাননে তাদের সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে। তারা ২০০৬ সালে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধে জড়িত ছিল। ২০২৪ সালের ইসরাইল হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার জন্য লেবানন আক্রমণ করে এবং হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে ইসরাইলের ভয়াবহ আক্রমণে হিজবুল্লাহর তৎকালিন প্রধান হাসান নাসরুল্লাহকে নিহত হয়। ইসরাইল এই সময়ে হিজবুল্লাহর ১৪০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল, এবং এ সময় দক্ষিণ বৈরুতে সংগঠনটির বিভিন্ন ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছিল। বৈরুতে ইসরাইলের আঘাত করা একেকটি বোমার ওজন ছিল প্রায় ১টন।
হিজবুল্লাহ গেরিলা যুদ্ধ কৌশলে পারদর্শী। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে এবং ইসরায়েলের সীমান্তে তারা সুড়ঙ্গ,
আশ্রয়কেন্দ্র,
এবং রকেট লঞ্চার ব্যবস্থার সাহায্যে লড়াই করে। তারা লুকোচুরি আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ক্ষতি করতে অভ্যস্ত।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক:
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং বেশ কিছু পশ্চিমা দেশ হিজবুল্লাহকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে গণ্য করে। হিজবুল্লাহ ইরান ও সিরিয়ার সমর্থন পেয়ে থাকে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করছে।
সামাজিক এবং রাজনৈতিক ভূমিকা:
সামাজিক সেবা: হিজবুল্লাহ লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়ের জন্য স্কুল,
হাসপাতাল এবং অন্যান্য সামাজিক সেবা প্রদান করে থাকে। এটি তাদের জনসমর্থন বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।
রাজনৈতিক শক্তি: লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় দেশটির দক্ষিণাঞ্চল নিজেদের দখলে নেয় হিজবুল্লাহ। ১৯৯২ সাল থেকেই দেশটির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসছে সংগঠনটি। লেবাননের প্রথম সারির রাজনৈতিক দল হিসেবেও এদের বিবেচনা করা হয়। হিজবুল্লাহ লেবাননের সংসদে আসন ধরে রেখেছে এবং রাজনৈতিকভাবে তাদের অবস্থান অনেক শক্তিশালী।
বিতর্ক এবং চ্যালেঞ্জ:
হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৮০-৯০ দশকে বিভিন্ন আক্রমণের জন্য তাদের দায়ী করা হয়েছে। হিজবুল্লাহ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষে লড়াই করে। এই ভূমিকা তাদের সমর্থকদের মধ্যে কিছু বিভেদ তৈরি করেছে, তবে এটি সিরিয়া ও ইরানের সাথে তাদের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে।
হিজবুল্লাহর ইতিহাস লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়ন এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যদিও তারা লেবাননের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠেছে, তাদের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে তাদের ভূমিকা তাদেরকে একটি জটিল এবং বিতর্কিত গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কোন মন্তব্য নেই