Header Ads

কুম্ভ মেলা কি? নামকরণ ইতিহাস ও ধর্মীয় গুরুত্ব

আমাদের বিশ্বে প্রধানত ৪টি ধর্ম রয়েছে, এই ধর্ম গুলোর মধ্যে প্রতিটিরই রয়েছে নির্দিষ্ট জনসমাবেশ করার স্থান সময়। ধর্মীয় এই জনসমাবেশ গুলোতে সাধারণ জনগণ একত্রিত হয় এবং প্রার্থনা করে থাকে। বড় বড় ধর্মীয় জনসমাবেশ গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ সমাবেশ হচ্ছে ভারতে হিন্দু ধর্মালম্বীদের কুম্ভ মেলা।

কুম্ভ মেলা কি:

ভারতে কুম্ভমেলা (Kumbh Mela) উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা তীর্থস্নান করতে আসেন। বিশ্বের বৃহত্তম শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হিসেবে এর রেকর্ড রয়েছে। সাধারণ কুম্ভমেলা প্রতি চার বছর অন্তর আয়োজিত হয়। প্রতি ছয় বছর অন্তর হরিদ্বার (গঙ্গা) (এলাহাবাদ) অর্ধকুম্ভ আয়োজিত হয়। প্রতি বারো বছর অন্তর প্রয়াগ, হরিদ্বার, উজ্জ্বয়িনী নাসিকে পূর্ণকুম্ভ আয়োজিত হয়। বারোটি পূর্ণকুম্ভ অর্থাৎ প্রতি ১৪৪ বছর অন্তর প্রয়াগে (গঙ্গা - যমুনা - সরস্বতী নদীর সঙ্গমে) আয়োজিত হয় মহাকুম্ভ।

২০০৭ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ ৪৫ দিন ব্যাপী সর্বশেষ অর্ধকুম্ভ আয়োজিত হয়েছে। সাত কোটিরও বেশি হিন্দু তীর্থযাত্রী প্রয়াগে এই মেলায় যোগ দেন। ১৫ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তির দিন ৫০ লক্ষ মানুষ তীর্থস্নান করেন। ২০০১ সালে সর্বশেষ মহাকুম্ভে যোগ দিয়েছিলেন ছয় কোটি হিন্দু। এটিই ছিল ইতিহাসের বৃহত্তম জনসমাবেশ। কুম্ভমেলা চারটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আয়োজিত হয়। এই চারটি স্থান নির্বাচিত হয় বৃহস্পতি সূর্যের অবস্থান অনুসারে। বৃহস্পতি সূর্য সিংহ রাশিতে অবস্থান করলে নাসিকের ত্র্যম্বকেশ্বরে; সূর্য মেষ রাশিতে অবস্থান করলে হরিদ্বারে; বৃহস্পতি বৃষ রাশিতে এবং সূর্য কুম্ভ রাশিতে অবস্থান করলে প্রয়াগে; এবং সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থান করলে উজ্জয়িনীতে মেলা আয়োজিত হয়। সূর্য, চন্দ্র বৃহস্পতির রাশিগত অবস্থান অনুযায়ী মেলা আয়োজনের তিথি নির্ধারিত হয়।

কুম্ভ মেলার নামকরণ:

কুম্ভ মেলার নামকরণ মূলত পুরাণের একটি কাহিনী থেকে উদ্ভূত। "কুম্ভ" শব্দটির অর্থ হল "কলস" বা "পাত্র" এবং এটি একটি বিশেষ কাহিনীর সাথে সম্পর্কিত যেখানে দেবতা অসুররা সমুদ্র মন্থন বা সমুদ্র থেকে অমৃত বা অমরত্বের মধু লাভের জন্য মন্থন করেছিলেন। এই কাহিনীটি শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ, এবং মহাভারত- উল্লেখিত রয়েছে। কথিত আছে যে, একবার দেবতা এবং অসুররা সমুদ্র মন্থন করে অমৃত লাভের জন্য একত্রিত হয়। সমুদ্র মন্থন থেকে ১৪টি মূল্যবান বস্তু বের হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল অমৃতভর্তি একটি কুম্ভ বা পাত্র। এই অমৃতের জন্য দেবতা অসুরদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, এবং এই যুদ্ধ ১২ দিন বা দেবতাদের হিসাবে ১২ বছর ধরে চলে। অমৃতের কুম্ভটি চারটি স্থানে পৌঁছেছিল: প্রয়াগরাজ, হরিদ্বার, নাসিক, এবং উজ্জয়িনী। এই স্থানগুলোতে কুম্ভ মেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে, সেখানকার নদীতে স্নান করলে তারা পাপমুক্ত হতে পারবেন। এই কাহিনীর ওপর ভিত্তি করেই মেলার নামকরণ করা হয়েছে "কুম্ভ মেলা"

কুম্ভ মেলার ইতিহাস:

কুম্ভ মেলার ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো, এবং এটি হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব হিসেবে বিবেচিত হয়। মেলার উৎপত্তি পুরাণে বর্ণিত সমুদ্র মন্থন কাহিনীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, যেখানে দেবতা অসুররা অমরত্বের মধুর জন্য সমুদ্র মন্থন করেছিলেন।

প্রাচীন যুগ: কুম্ভ মেলার সঠিক সময়কাল নির্ধারণ করা কঠিন হলেও, প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে এর চর্চা রয়েছে বলে মনে করা হয়। হিন্দু ধর্মের প্রাচীন শাস্ত্র এবং গ্রন্থে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। কুম্ভ মেলা প্রথম প্রামাণ্য নথি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে হিউয়েন সাঙ-এর রচনায়, যিনি সপ্তম শতাব্দীতে চীনা পর্যটক হিসেবে ভারতে এসেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে প্রয়াগে একটি বড় ধর্মীয় উৎসব পালিত হত, যেখানে হাজার হাজার মানুষ যোগদান করত।

মধ্যযুগ: মুঘল যুগে, বিশেষ করে সম্রাট আকবরের শাসনকালে (১৫৫৬-১৬০৫), প্রয়াগরাজ (তৎকালীন এলাহাবাদ) মেলার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। আকবর এই স্থানকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করতেন এবং তিনি শহরটির নামকরণ করেন "ইলাহাবাস" (অর্থাৎ আল্লাহর দ্বারা আশীর্বাদপ্রাপ্ত) এরপর থেকে প্রয়াগ কুম্ভ মেলার জন্য একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

আধুনিক যুগ: কুম্ভ মেলা সময়ের সাথে আরও বৃহৎ এবং সাংগঠনিকভাবে পরিপক্ক হয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে কুম্ভ মেলা একটি সুসংগঠিত উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং ব্রিটিশ প্রশাসন নিরাপত্তা জনস্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত ব্যবস্থা নেয়। ব্রিটিশ আমলের শেষে এবং স্বাধীনতার পর, কুম্ভ মেলার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় এবং এটি ভারতের একটি জাতীয় অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বিশ্বের বৃহত্তম সমাবেশ: কুম্ভ মেলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সমাবেশ হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৯, ২০০১, ২০১৩ এবং ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত প্রয়াগরাজ কুম্ভ মেলায় লক্ষাধিক থেকে কোটি কোটি মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। আধুনিক সময়ে, কুম্ভ মেলা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে।

কুম্ভ মেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য:

শাহী স্নান: কুম্ভ মেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আচার হলো শাহী স্নান। বিভিন্ন আখাড়ার সাধু-সন্ন্যাসীরা প্রথমে এই স্নানে অংশগ্রহণ করেন, তারপরে অন্যান্য ভক্তরা। এটি মেলার মূল আয়োজন এবং বিশেষ দিনে বিশেষভাবে পালিত হয়।

আখাড়া শোভাযাত্রা: মেলায় আখাড়াগুলোর বিশাল শোভাযাত্রা দেখা যায়, যেখানে সন্ন্যাসী যোগীরা ধর্মীয় রীতিনীতির অংশ হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। তাদের স্নানকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয়, কারণ তারা সমাজের আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব প্রদান করেন।

ভক্তদের অংশগ্রহণ: কুম্ভ মেলায় লক্ষ লক্ষ ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী, এবং তীর্থযাত্রী অংশ নেন। বিশ্বজুড়ে থেকে হিন্দু ভক্তরা এই মেলায় সমবেত হন, এবং এটি একটি বিশাল আন্তর্জাতিক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

পবিত্র স্নান: প্রধান আকর্ষণ হলো পবিত্র নদীতে স্নান, যা হিন্দু ধর্ম অনুসারে পাপমোচন এবং পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি লাভের পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে মেলার সময় এই নদীগুলোতে স্নান করলে আধ্যাত্মিক লাভ হয়।

সাধুদের উপস্থিতি: বিভিন্ন আখাড়ার সাধুদের পাশাপাশি নকট, নাগা সাধু, এবং অঘোরীদের মতো বিভিন্ন ধরনের সাধুদেরও দেখা যায়। তারা তাদের আধ্যাত্মিক শক্তি কঠোর তপস্যার জন্য বিখ্যাত।

কুম্ভ মেলার বিশালতা:

কুম্ভ মেলার সমাবেশ লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশে রূপান্তরিত হয়, এবং বিশেষ দিনে (যেমন মকর সংক্রান্তি, বসন্ত পঞ্চমী) এই সংখ্যা প্রায় কয়েক কোটিতে পৌঁছায়।

২০১৩ সালে প্রয়াগরাজে অনুষ্ঠিত কুম্ভ মেলা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনসমাবেশ, যেখানে প্রায় ১০ কোটি মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল।

মেলার সময় অস্থায়ী শহর তৈরি করা হয়, যেখানে ভক্তদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। সরকারের পক্ষ থেকেও বিশাল আয়োজন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

কুম্ভ মেলার গুরুত্ব:

ধর্মীয়: এটি হিন্দুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব, যেখানে ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে পবিত্র নদীতে স্নান করলে তাদের পাপমোচন হবে এবং মোক্ষ লাভ হবে।

সাংস্কৃতিক: কুম্ভ মেলা ভারতীয় সংস্কৃতি ঐতিহ্যের একটি অংশ। এটি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের লোকদের মিলনস্থল।

সামাজিক: কুম্ভ মেলা শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের একত্রিত হওয়ার একটি সামাজিক মঞ্চও।

কুম্ভ মেলায় পদদলিত হওয়ার ঘটনা:

১৯৫৪ সালের প্রয়াগরাজ কুম্ভ মেলা: এটি কুম্ভ মেলার ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক পদদলিত হওয়ার ঘটনা। ১৯৫৪ সালে প্রয়াগরাজে অনুষ্ঠিত কুম্ভ মেলার সময় প্রায় ৪০ লক্ষ লোক সমবেত হয়েছিল। এই বিশাল জনসমাবেশের মাঝে সঠিক নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং তীর্থযাত্রীদের প্রবল ভিড়ের কারণে পদদলিতের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় প্রায় ৮০০-১০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছিলেন।


১৯৮৬ সালের হরিদ্বার কুম্ভ মেলা: এই কুম্ভ মেলার সময় পদদলিতের ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে প্রায় ৫০ জন লোক নিহত হয়েছিলেন। অতিরিক্ত জনসমাগম এবং সমাবেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ছিল।

২০০৩ সালের নাসিক কুম্ভ মেলা: নাসিকের কুম্ভ মেলার সময়ও একটি মারাত্মক পদদলিতের ঘটনা ঘটে। শাহী স্নানের সময় ভক্তরা গডাবরী নদীর তীরে স্নান করতে তাড়াহুড়ো করছিলেন, যা একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এই ঘটনায় প্রায় ৩৯ জন লোক প্রাণ হারান এবং বহু মানুষ আহত হন।

২০১৩ সালের প্রয়াগরাজ কুম্ভ মেলা: এই মেলায় কোটিরও বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। যদিও স্নান ঘাটে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি, তবে প্রয়াগরাজ রেলওয়ে স্টেশনে বাড়তি ভিড়ের কারণে পদদলিতের ঘটনা ঘটে। রেলস্টেশনে ভিড়ের চাপ বিশৃঙ্খলার ফলে ৩৬ জন মারা যান এবং প্রায় ৩০ জন আহত হন।

কুম্ভ মেলার ইতিহাস এভাবে প্রাচীন ধর্মীয় আচার থেকে শুরু করে আধুনিককালের বৃহত্তম সামাজিক-ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.