Header Ads

বিশ্বের শীর্ষ ১০ জন স্বৈরশাসক ও তাদের জীবন

স্বৈরশাসক বা একনায়করা হলেন এমন শাসক যারা ক্ষমতা একচেটিয়া করে রাখেন এবং প্রায়শই রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে শাসন করেন। ইতিহাসে অনেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং তাদের শাসনামলে নৃশংসতার জন্য কুখ্যাত হয়েছেন। শীর্ষ ১০ স্বৈরশাসকের তালিকায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম উঠে আসে। নিচে তাদের মধ্যে শীর্ষ ১০ জনের নাম সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হলো:

. এডলফ হিটলার (জার্মানি, ১৯৩৩-১৯৪৫)

এডলফ হিটলার (১৮৮৯-১৯৪৫) ছিলেন জার্মানির নাৎসি দলের নেতা এবং ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জার্মানির চ্যান্সেলর এবং একনায়ক হিসেবে শাসন করেন। তিনি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণিত আলোচিত স্বৈরশাসক। হিটলারের শাসনামলে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) শুরু হয়েছিল। তার নাৎসি আদর্শ নীতির ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে, বিশেষ করে ইহুদি জনগোষ্ঠীর উপর ভয়াবহ গণহত্যা, যা "হলোকাস্ট" নামে পরিচিত।


হিটলার ১৯২০-এর দশকে নাৎসি পার্টিতে যোগ দেন এবং ১৯২৩ সালে মিউনিখে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। কারাগারে থাকার সময় তিনি তার বই Mein Kampf (আমার সংগ্রাম) লেখেন, যেখানে তিনি তার আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। এতে তিনি ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং "আর্য জাতি" শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি করেন।

হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানি ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমণ করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করে। তার উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপে জার্মান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং "জীবনধারণের স্থান" (Lebensraum) প্রসারিত করা। যুদ্ধ চলাকালে হিটলার "ফাইনাল সলিউশন" নামে ইহুদি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর ফলে মিলিয়ন ইহুদিসহ প্রায় ১১ মিলিয়ন মানুষ বিভিন্ন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিহত হয়।

এডলফ হিটলার অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির একটি ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব ছিল কঠিন, এবং তিনি শিল্পী হতে চেয়েছিলেন কিন্তু ব্যর্থ হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে অংশ নেওয়ার পর, তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধের শেষ দিকে, যখন জার্মানি চূড়ান্তভাবে পরাজয়ের পথে, হিটলার বার্লিনের এক বাঙ্কারে আত্মহত্যা করেন। তার মৃত্যু এবং নাৎসি পার্টির পতনের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

হিটলারের শাসনামলে ইউরোপ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল, এবং তার আদর্শ কর্মকাণ্ড মানব ইতিহাসে গভীর কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়। বিশ্বব্যাপী তার শাসনামলকে স্বৈরাচার নিষ্ঠুরতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, এবং তার আদর্শবিরোধী গণহত্যা যুদ্ধকে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম মানবিক বিপর্যয় হিসেবে গণ্য করা হয়।

. জোসেফ স্টালিন (সোভিয়েত ইউনিয়ন, ১৯২৪-১৯৫৩)

জোসেফ স্টালিন (১৮৭৮-১৯৫৩) ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা এবং ১৯২৪ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত দেশের একনায়কতান্ত্রিক শাসক। তার শাসনকাল সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য এক বিশাল পরিবর্তনের সময় ছিল, তবে এটি অত্যাচার, গণহত্যা, এবং ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্যও কুখ্যাত। স্টালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি শক্তিশালী শিল্প সামরিক শক্তি হয়ে উঠলেও, লক্ষ লক্ষ মানুষ তার শাসনে ভয়াবহ নির্যাতন মৃত্যুর শিকার হয়েছিল।


জোসেফ স্টালিন জর্জিয়ার গরি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু পরে তিনি বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। রাশিয়ান বিপ্লবের সময় তিনি বলশেভিক পার্টিতে যোগ দেন এবং ভ্লাদিমির লেনিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠেন।

লেনিনের মৃত্যুর পর স্টালিন কৌশলে ক্ষমতা দখল করেন এবং ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বাড়িয়ে তোলেন। লেনিনের উত্তরসূরি হিসেবে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাস্ত করতে স্টালিন বিভিন্ন চক্রান্ত ষড়যন্ত্র চালান। লেভ ট্রটস্কি, নিকোলাই বুখারিন সহ অন্যান্য বিপ্লবী নেতাদের তিনি ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন এবং ট্রটস্কিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বহিষ্কার করেন।

স্টালিন ছিলেন একজন নিষ্ঠুর সন্দেহপ্রবণ নেতা, যিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য তার চারপাশের লোকদের প্রতি চরম অবিশ্বাস পোষণ করতেন। তার শাসনে বহু মানুষ নির্যাতিত নিহত হয়েছে। তবুও সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেক মানুষ তাকে একজন মহান নেতা হিসেবে দেখেছিল, কারণ তার নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বব্যাপী একটি শক্তিশালী সামরিক অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠেছিল।

১৯৫৩ সালে স্টালিনের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি নিকিতা ক্রুশ্চেভ তার নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্টালিনের অত্যাচারের নিন্দা করেন এবং সোভিয়েত সমাজে কিছুটা শিথিলতা আনার চেষ্টা করেন। স্টালিনের শাসনকাল আজও বিতর্কিত, এবং তার নাম ইতিহাসে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক হিসেবে খোদিত হয়ে আছে।

. মাও সেতুং (চীন, ১৯৪৯-১৯৭৬)

মাও সেতুং (১৮৯৩১৯৭৬), চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের অন্যতম নেতা এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ১৯৪৯ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত চীনের শীর্ষ নেতা ছিলেন এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘকাল শাসন করেন। মাও সেতুং-এর নীতি আদর্শ চীনের সামাজিক, রাজনৈতিক, এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যদিও তার অনেক নীতি দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।

মাও ১৮৯৩ সালে চীনের হুনান প্রদেশে একটি কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল চীনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে। ১৯২১ সালে তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হন। চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বাধীন কুওমিনতাং (জাতীয়তাবাদী দল) এবং কমিউনিস্টদের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালীন মাও গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের উপর ভিত্তি করে বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলেন।


১৯৩৪-১৯৩৫ সালের লং মার্চ মাও সেতুং-এর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই দীর্ঘপথে কমিউনিস্ট বাহিনী কুওমিনতাং-এর কাছ থেকে পালিয়ে চীনের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে নতুন ভিত্তি স্থাপন করে। মাও এই অভিযানে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে তার অবস্থান সুদৃঢ় হয়।

১৯৪৯ সালে চিয়াং কাইশেকের কুওমিনতাং বাহিনীকে পরাজিত করার পর মাও চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষমতায় আনেন এবং অক্টোবর, ১৯৪৯ সালে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে চীন একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়।

মাও-এর শাসনকালে চীন অভ্যন্তরীণভাবে স্থিতিশীল শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও তার কিছু নীতির ফলে দেশটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সামাজিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। মাওয়ের "গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড" এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব চীনের জনসংখ্যা, শিল্প, এবং শিক্ষাব্যবস্থার উপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। এছাড়া তার শাসনের সময় ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায় বা দুর্দশার শিকার হন।

১৯৭৬ সালে মাও সেতুং-এর মৃত্যু হয়, এবং তার মৃত্যুর পর চীনে ধীরে ধীরে উদারপন্থী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করা হয়। তার উত্তরসূরি দেং শিয়াওপিং চীনে অর্থনৈতিক সংস্কার চালু করেন, যা দেশটিকে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়।

মাও সেতুং চীনের ইতিহাসে একটি বিশাল প্রভাব রেখেছেন। যদিও তিনি চীনের স্বাধীনতা এবং আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তার নীতির কারণে সৃষ্ট বিপর্যয় চীনের মানুষকে দীর্ঘদিন ভুগতে হয়েছে।

. পল পট (কম্বোডিয়া, ১৯৭৫-১৯৭৯)

পল পট (১৯২৫-১৯৯৮) ছিলেন কম্বোডিয়ার কুখ্যাত একনায়ক এবং খমের রুজ (Khmer Rouge) বিদ্রোহী দলের নেতা। তিনি ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় শাসন করেন। তার নেতৃত্বে কম্বোডিয়ায় একটি চরম সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু হয়, যা দেশের অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা এবং জনসংখ্যার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। তার শাসনের সময় . থেকে মিলিয়ন মানুষ হত্যাকাণ্ড, অতিরিক্ত শ্রম, অনাহার এবং চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। পল পটের শাসন ছিল ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর গণহত্যার উদাহরণ।

পল পটের আসল নাম সালথ সার। তিনি ১৯২৫ সালে কম্বোডিয়ার একটি মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষাজীবন ফ্রান্সে কাটানো হয়, যেখানে তিনি কমিউনিজমের সাথে পরিচিত হন এবং কমিউনিস্ট আদর্শে প্রভাবিত হন। দেশে ফিরে তিনি কম্বোডিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে খমের রুজ দলের নেতৃত্বে আসেন।


খমের রুজ একটি চরমপন্থী কমিউনিস্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠী ছিল, যারা ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালীন কম্বোডিয়ায় জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৭৫ সালে তারা রাজধানী নমপেন দখল করে এবং পল পটকে দেশের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ক্ষমতায় আসার পর পল পট কম্বোডিয়ার নাম পরিবর্তন করে "ডেমোক্রেটিক কম্পুচিয়া" রাখেন এবং দেশে একটি চরমপন্থী কৃষকসমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। পল পটের শাসনকাল ছিল চরমপন্থী কমিউনিস্ট নীতির অধীনে পরিচালিত। তার প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি সম্পূর্ণ কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সমস্ত শিল্প শহুরে কার্যক্রম বন্ধ করা।

১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামি বাহিনী খমের রুজ সরকারকে পরাজিত করে এবং পল পট ক্ষমতাচ্যুত হন। এর পর তিনি কম্বোডিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পালিয়ে যান এবং সেখানে গেরিলা যুদ্ধ চালাতে থাকেন। পল পট জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হন। ১৯৯৮ সালে তিনি প্রাকৃতিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তার বিরুদ্ধে কখনো কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি, যা অনেকের কাছে হতাশার কারণ ছিল।

পল পটের শাসনকাল ছিল কম্বোডিয়ার জন্য একটি কালো অধ্যায়। তার নীতির কারণে দেশটি সামাজিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিকভাবে ধ্বংস হয়েছিল। গণহত্যা অত্যাচারের ফলে কম্বোডিয়ার জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ লোক মারা যায়, যা দেশের জন্য এক অপ্রতিরোধ্য ক্ষতি। পল পটের শাসন এবং খমের রুজ যুগ আজও কম্বোডিয়া বিশ্বের মানবাধিকার ইতিহাসে গভীর বেদনার স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে।

. কিম জং ইল (উত্তর কোরিয়া, ১৯৯৪-২০১১)

কিম জং ইল (১৯৪১ বা ১৯৪২ - ২০১১) ছিলেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা এবং কোরিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা। তিনি ১৯৯৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার একনায়ক হিসেবে দেশ শাসন করেন। তার নেতৃত্বে উত্তর কোরিয়া তার পূর্বসূরি কিম ইল সুং-এর প্রতিষ্ঠিত কঠোর কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থা ধরে রেখেছিল। কিম জং ইলের শাসনামলে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকে এবং দেশব্যাপী দারিদ্র্য খাদ্য সংকট বেড়ে যায়। তার শাসনকে উত্তর কোরিয়ার সামরিক পারমাণবিক ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য স্মরণ করা হয়, কিন্তু দেশটি মানবাধিকারের ভয়াবহ লঙ্ঘনের জন্য কুখ্যাত।


কিম জং ইল ১৯৪১ বা ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন বলে জানা যায়, যদিও তার জন্মস্থান এবং জন্মতারিখ নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। সরকারি তথ্যে বলা হয় যে তিনি মাউন্ট পায়েক্তু নামে একটি ঐতিহাসিক স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু অনেক বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন যে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতা কিম ইল সুং ছিলেন উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম নেতা। কিম জং ইল ছোটবেলা থেকেই তার বাবার দ্বারা প্রভাবিত হন এবং উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত হন।

১৯৯৪ সালে কিম ইল সুং-এর মৃত্যুর পর কিম জং ইল উত্তর কোরিয়ার শাসনভার গ্রহণ করেন। তার শাসনে উত্তর কোরিয়া একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হতে থাকে, যেখানে কিম পরিবারকে ঘিরে ব্যাপক ব্যক্তিত্বের পূজা চালু ছিল। কিম জং ইল তার শাসন শক্তিশালী করার জন্য দেশের সামরিক বাহিনীর ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন এবং "সেনাবাহিনীর অগ্রাধিকার" নীতি প্রণয়ন করেন, যার মাধ্যমে সামরিক বাহিনীকে দেশের শাসনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা দেওয়া হয়।

কিম জং ইলের শাসনকাল বিভিন্ন কারণে উল্লেখযোগ্য, বিশেষত তার সামরিক পারমাণবিক নীতির জন্য। তার শাসনামলে উত্তর কোরিয়া বহির্বিশ্ব থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে এবং দেশটি খাদ্য সংকটসহ বহু আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়।

কিম জং ইল ২০১১ সালের ১৭ ডিসেম্বর একটি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র কিম জং উন উত্তর কোরিয়ার নেতা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। কিম জং ইল তার শাসনকালে উত্তর কোরিয়াকে সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন, তবে তার শাসনকে মানবাধিকার লঙ্ঘন, খাদ্য সংকট, এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার জন্যও সমালোচিত করা হয়।

কিম জং ইলের শাসনের পর উত্তর কোরিয়া এখনও তার পারমাণবিক কর্মসূচি বজায় রেখেছে এবং তার উত্তরসূরির অধীনে দেশটি একই ধরনের শাসনব্যবস্থা ধরে রেখেছে, যা উত্তর কোরিয়ার জনগণের জীবনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

. সাদ্দাম হোসেন (ইরাক, ১৯৭৯-২০০৩)

সাদ্দাম হোসেন (১৯৩৭-২০০৬) ছিলেন ইরাকের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এবং ১৯৭৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরাকের একনায়কতান্ত্রিক শাসক। তার শাসনকাল ছিল ইরাকের রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সময়, তবে এটি ছিল দমনমূলক শাসন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্যও কুখ্যাত। সাদ্দাম হোসেনের শাসনের সময় ইরাক বহু যুদ্ধ সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, যার মধ্যে রয়েছে ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮), কুয়েত আক্রমণ (১৯৯০), এবং দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ (২০০৩) তিনি তার শাসনকে রক্ষা করতে অত্যাচার, হত্যা, এবং দমনমূলক কৌশল ব্যবহার করতেন।


সাদ্দাম হোসেন ১৯৩৭ সালের ২৮ এপ্রিল ইরাকের তিকরিতে একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব ছিল চরম দারিদ্র্য এবং অসুস্থতার মধ্যে। ২০ বছর বয়সে তিনি ইরাকের বাথ পার্টিতে যোগ দেন, যা ছিল একটি আরব জাতীয়তাবাদী সমাজতান্ত্রিক দল। ১৯৫৯ সালে তিনি ইরাকের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আবদুল করিম কাসিমের বিরুদ্ধে একটি ব্যর্থ হত্যাচেষ্টায় অংশ নেন এবং পরে পালিয়ে মিশর চলে যান। ১৯৬৮ সালে বাথ পার্টি ক্ষমতা দখল করে এবং সাদ্দাম দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন।

১৯৭৯ সালে সাদ্দাম হোসেন ইরাকের রাষ্ট্রপতি হন এবং দেশটির সর্বময় ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন। ক্ষমতায় আসার পর তিনি ইরাকে একটি একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে বাথ পার্টির নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের রাজনৈতিক সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। তার শাসনে বাথ পার্টি এবং তার পরিবারভিত্তিক ক্ষমতা কাঠামো ছিল দেশের কেন্দ্রীয় শক্তি।

সাদ্দাম হোসেনের শাসনকাল ছিল কঠোর সামরিক শক্তি এবং জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে। তার শাসনের সময় ইরাকের অর্থনীতি মূলত তেল উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল ছিল এবং তিনি দেশে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়নের চেষ্টা করেন। তবে তার সামরিক বৈদেশিক নীতির ফলে দেশটি একাধিক যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভিযান চালানো হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা দাবি করে যে ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (Weapons of Mass Destruction - WMD) রয়েছে, যা বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি। এই অভিযানের ফলে সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ইরাকের বাথ পার্টি সরকারের পতন ঘটে।

২০০৩ সালের ডিসেম্বরে সাদ্দাম হোসেনকে মার্কিন বাহিনী একটি গোপন আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে ইরাকের জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। ২০০৬ সালে ইরাকের একটি আদালতে সাদ্দাম হোসেনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর তাকে ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

. মুয়াম্মার গাদ্দাফি (লিবিয়া, ১৯৬৯-২০১১)

মুয়াম্মার গাদ্দাফি (১৯৪২-২০১১) ছিলেন লিবিয়ার একনায়ক এবং ১৯৬৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশটির শাসক। তার পুরো শাসনকাল ছিল চার দশক দীর্ঘ, যা লিবিয়াকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়। গাদ্দাফি ছিলেন একনায়কতান্ত্রিক শাসক, এবং তার শাসনকালকে চরম দমনমূলক, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতির জন্য কুখ্যাত করা হয়। তবে একই সাথে তিনি লিবিয়ায় তেলের অর্থনীতি এবং আফ্রিকার রাজনীতিতে প্রভাবশালী ছিলেন।

মুয়াম্মার গাদ্দাফি ১৯৪২ সালে লিবিয়ার একটি বেদুইন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং তরুণ বয়সেই মিশরে পড়াশোনা করতে যান, যেখানে তিনি আরব জাতীয়তাবাদ এবং নাসেরের সমাজতান্ত্রিক দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হন। ১৯৬৯ সালে, মাত্র ২৭ বছর বয়সে, তিনি একটি শান্তিপূর্ণ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লিবিয়ার রাজা ইদ্রিসকে উৎখাত করেন এবং দেশটির নেতৃত্বে আসেন।


গাদ্দাফি প্রথমে নিজেকে লিবিয়ার বিপ্লবী নেতা হিসেবে পরিচিত করান এবং তার শাসনকে "জামাহিরিয়া" নামে পরিচিত করেছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি "গণতান্ত্রিক জনগণীয় শাসন" প্রতিষ্ঠা করার দাবি করেছিলেন। তবে বাস্তবে তার শাসন ছিল একনায়কতান্ত্রিক এবং ব্যক্তিগত ক্ষমতাভিত্তিক। তিনি দেশের সব রাজনৈতিক শক্তিকে নিষিদ্ধ করেন এবং দেশের ক্ষমতা তার হাতে কেন্দ্রীভূত করেন।

২০১১ সালে আরব বসন্ত নামে পরিচিত গণআন্দোলনের ঢেউ লিবিয়াতেও পৌঁছায়। গাদ্দাফির বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারী জনগণ একটি বিপ্লব শুরু করে, যা ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। জাতিসংঘের অনুমোদনে ন্যাটোর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে লিবিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো গাদ্দাফির বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

অবশেষে, ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর, বিদ্রোহীদের হাতে গাদ্দাফি ধরা পড়েন এবং তাকে মিসরাতায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তার পতন মৃত্যুর পর লিবিয়া একটি চরম বিশৃঙ্খল অস্থির পরিস্থিতিতে পড়ে, যা দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধ এবং অস্থিতিশীলতার মধ্যে ঠেলে দেয়।

. ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকো (স্পেন, ১৯৩৯-১৯৭৫)

ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকো (১৮৯২-১৯৭৫) ছিলেন স্পেনের একনায়ক এবং ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেশটির শাসক। ফ্রাংকো স্পেনের গৃহযুদ্ধের (১৯৩৬-১৯৩৯) পর ক্ষমতায় আসেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশটিকে শাসন করেন। তার শাসনকে "ফ্রাঙ্কোবাদ" (Francoism) নামে অভিহিত করা হয়, যা ছিল একটি ফ্যাসিবাদী, একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ফ্রাংকোর শাসন কঠোর দমনমূলক নীতি, গোঁড়া রক্ষণশীলতা এবং স্পেনের সংস্কৃতি ভাষাগত বৈচিত্র্যের উপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণের জন্য কুখ্যাত ছিল।

ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকো ১৮৯২ সালের ডিসেম্বর স্পেনের গালিসিয়া অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল একটি সামরিক পরিবার এবং তিনি নিজেও সামরিক একাডেমিতে যোগ দিয়ে সেনাবাহিনীতে ক্যারিয়ার শুরু করেন। ফ্রাংকো তার সামরিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মরক্কোতে স্পেনের উপনিবেশিক যুদ্ধে অংশ নেন এবং সামরিক ক্ষেত্রে তার সাফল্যের জন্য দ্রুত পদোন্নতি লাভ করেন।


১৯৩৬ সালে স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যখন দেশের বামপন্থী ডানপন্থী দলগুলির মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। স্পেনের নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার এবং বামপন্থী শক্তির বিপরীতে ফ্রাংকোসহ ডানপন্থী সামরিক কর্মকর্তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এই বিদ্রোহ স্পেনকে একটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত করে।

ফ্রাংকোর নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী বাহিনী অবশেষে ১৯৩৯ সালে বিজয়ী হয় এবং তিনি স্পেনের পূর্ণ ক্ষমতা দখল করেন। ফ্রাংকো নিজেকে "কাউদিল্লো" (Caudillo) বা সর্বময় নেতা ঘোষণা করেন এবং স্পেনকে একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করেন। গৃহযুদ্ধের পরে ফ্রাংকোর শাসনে লক্ষাধিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা বা কারারুদ্ধ করা হয়। ফ্রাংকোর শাসন ছিল কঠোরভাবে রক্ষণশীল, ফ্যাসিবাদী এবং ক্যাথলিক চার্চের ঘনিষ্ঠ। তার শাসন দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, এবং সাংস্কৃতিক জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল।

ফ্রাংকো তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্পেনের শাসক ছিলেন। তিনি ১৯৭৫ সালের ২০ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর স্পেন গণতন্ত্রের দিকে ফিরে যায় এবং রাজা হুয়ান কার্লোস I নতুন রাজা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। হুয়ান কার্লোস ফ্রাংকোর উত্তরসূরি হিসেবে ক্ষমতায় আসলেও তিনি স্পেনকে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত করেন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

. বেনিতো মুসোলিনি (ইতালি, ১৯২২-১৯৪৩)

বেনিতো মুসোলিনি (১৮৮৩-১৯৪৫) ছিলেন ইতালির ফ্যাসিস্ট একনায়ক এবং ১৯২২ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রী। তিনি ফ্যাসিবাদী মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি জার্মানির অন্যতম মিত্র ছিলেন। মুসোলিনি নিজেকে "দ্য ডুস" নেতা হিসেবে পরিচিত করান, এবং তার শাসন ছিল রাজনৈতিক দমনপীড়ন, জাতীয়তাবাদ, এবং সামরিক বর্ণবাদী নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত।

বেনিতো মুসোলিনি ১৮৮৩ সালের ২৯ জুলাই ইতালির ডোভিয়া ডি প্রেদাপ্পিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন সমাজতান্ত্রিক, এবং তার মা ছিলেন একজন ক্যাথলিক স্কুল শিক্ষিকা। প্রথম জীবনে মুসোলিনি সমাজতান্ত্রিক মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হন এবং সমাজতান্ত্রিক দলের একজন সদস্যও ছিলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি সমাজতন্ত্রের বিপরীতে জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদী মতবাদ গ্রহণ করেন।


১৯১৯ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, মুসোলিনি ইতালীয় যুদ্ধ ভেটেরান্সের মধ্যে ফ্যাসিবাদী আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯২১ সালে ইতালীয় ফ্যাসিস্ট পার্টি হিসেবে পরিণত হয়। তিনি ইতালিতে একটি কঠোর কেন্দ্রীভূত সরকার এবং জাতীয়তাবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদ প্রচার করতে শুরু করেন। ফ্যাসিবাদ ছিল একটি রাজনৈতিক মতবাদ যা শৃঙ্খলা, কর্তৃত্ব, এবং ব্যক্তির তুলনায় রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

মুসোলিনি ১৯২২ সালে তার "রোম অভিযানের" (March on Rome) মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। তার ফ্যাসিস্ট সমর্থকরা ইতালির রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং মুসোলিনি সরকারকে জোর করে ক্ষমতা দিতে বাধ্য করেন। ইতালির রাজা ভিক্টর ইমানুয়েল III তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন, এবং সেখান থেকে তিনি ধীরে ধীরে একটি একনায়কতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

মুসোলিনি তার শাসনকালে ইতালিকে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করেন এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক, এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি যখন পরাজয়ের মুখে পড়ে, তখন মুসোলিনির শাসন দুর্বল হয়ে যায়। ১৯৪৩ সালে মিত্রশক্তি ইতালিতে অভিযান চালানোর পর মুসোলিনিকে তারই নিজ সরকার দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, কিন্তু জার্মানির সহায়তায় তিনি পালিয়ে যান এবং একটি ফ্যাসিস্ট পুতুল সরকার গঠন করেন।

১৯৪৫ সালে যুদ্ধের শেষ দিকে, মুসোলিনি পালানোর চেষ্টা করলেও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৪৫ সালের ২৮ এপ্রিল, উত্তর ইতালির প্রতিরোধ বাহিনী তাকে এবং তার প্রেমিকা ক্লারা পেতাচ্চিকে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করে। তাদের মৃতদেহগুলো মিলানের একটি পাবলিক স্কোয়ারে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যা ছিল তার একনায়কতন্ত্রের নির্মম সমাপ্তি।

১০. রবার্ট মুগাবে (জিম্বাবুয়ে, ১৯৮০-২০১৭)

রবার্ট মুগাবে (১৯২৪-২০১৯) ছিলেন জিম্বাবুয়ের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এবং ১৯৮০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশের শাসক। তিনি ১৯৬০-এর দশকে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং পরে ১৯৮০ সালে স্বাধীন জিম্বাবুয়ে গঠনের পর তার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার দীর্ঘ শাসনকাল ছিল একদিকে জাতীয়তাবাদ অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির আরেকদিকে ব্যাপক দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য কুখ্যাত।

রবার্ট মুগাবে ১৯২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ রুডেসিয়া (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) এর একটি গরীব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সাহারা ঐতিহাসিক শাসনের অধীনে শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে ব্রিটেনের ডার্বি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। মুগাবে শিক্ষার জন্য তার আগ্রহের পাশাপাশি রাজনৈতিক সক্রিয়তা শুরু করেন এবং আফ্রিকান জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যোগ দেন।


মুগাবে ১৯৬০-এর দশকে জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান পিপলস ইউনিয়ন (জাপু) এবং পরবর্তীতে জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন (জানু) নামে পরিচিত আন্দোলনগুলির গুরুত্বপূর্ণ নেতার ভূমিকা পালন করেন। এই আন্দোলনগুলি ব্রিটিশ কলোনিয়াল শাসনের বিরুদ্ধে এবং স্থানীয় জনগণের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছিল। তার নেতৃত্বে, জানু এবং জাপু একটি দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য লড়াই করে।

১৯৮০ সালে, ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় এবং রুডেসিয়া স্বাধীনতা লাভ করে, যার নতুন নাম হয় জিম্বাবুয়ে। রবার্ট মুগাবে নতুন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি "বালান্সিং" (গভীরভাবে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা) এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন।

মুগাবের শাসনকাল ছিল একদিকে শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির আরেকদিকে ব্যাপক দুর্নীতি মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য কুখ্যাত।

২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে মুগাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তার পতনের পর নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইমারসন মানাঙ্গাগোয়া ক্ষমতা গ্রহণ করেন। মুগাবে পরে কিছু সময়ের জন্য স্বেচ্ছায় নির্বাসিত জীবনে যান এবং ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর, সিংগাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে।

এরা সকলেই স্বৈরাচারী শাসনের মাধ্যমে বিশ্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছেন এবং ইতিহাসে তাদের নাম নানা কারণেই কুখ্যাত।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.